- আসামিকে আদালতে নিতে কোনো গাড়ি নেই
- গাড়ি ভাড়া করে আদালতে নিতে হয় আসামিকে
- তদন্ত কর্মকর্তার ঘাড়ে আসামিকে বহন করার খরচ
- আসামি পালিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে সবসময়
দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে পুলিশ। আইনি যেকোনো সমস্যা, সংকট বা বিপদে নাগরিকদের প্রথম ভরসা এই বাহিনী। নাগরিকদের নিরাপত্তায় শহর থেকে গ্রামে সবখানে দিনরাত দায়িত্ব পালন করে চলেছেন পুলিশ সদস্যরা। তবে এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এই বাহিনীর সদস্যদের।
গাড়ি সংকটে দায়িত্ব পালন ব্যাহত হচ্ছে সরকারি এই বাহিনীর। পুলিশ সদস্যরা বলছেন, পর্যাপ্ত পরিবহন না থাকার কারণে অনেক সময় অপরাধী ধরতে বেগ পেতে হচ্ছে। এমনকি ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই নিরাপদে সরে পড়ছেন অপরাধীরা। অপরাধীদের গ্রেফতার করলেও সরকারি বরাদ্দ গাড়ি না থাকায় আদালতে পৌঁছে দেওয়াসহ নানান সমস্যায় পড়তে হয় এই বাহিনীকে।
‘থানায় মাত্র একটি গাড়ি বরাদ্দ থাকায় অপারেশন থেকে শুরু করে আদালতে আসামি নেওয়া পর্যন্ত আমাদের অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়। বিশেষ করে বড় ধরনের ক্রিমিনাল নিয়ে যাওয়া আসা করতে অনেক সমস্যা হয়। আসামি পালিয়ে যায় কি-না শঙ্কায় থাকেন পুলিশ সদস্যরা। বিয়ষটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানালেও আজ পর্যন্ত গাড়ি বরাদ্দ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি’—ফুলছড়ি থানার ওসি
গাইবান্ধা জেলার সাতটি থানা ও আটটি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ সদস্যদের বক্তব্যেই এমন সমস্যার কথা উঠে এসেছে। তারা বলছেন, সরকারি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পর্যাপ্ত গাড়ি বরাদ্দ দেওয়া সময়ের দাবি।
জাগো নিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানায় একটিমাত্র গাড়ি বরাদ্দ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসির) জন্য নিজস্ব কোনো সরকারি গাড়ি বরাদ্দ নেই। কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে, মাঠ পর্যায়ে অভিযান, আসামি গ্রেফতার—সব কাজেই গাড়িটি ব্যবহার করা হয়। গ্রেফতারের পর আসামিকে আদালতে নিতে ভরসা নিজস্ব মোটরসাইকেল, ভাড়া করা সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা অন্য কোনো যানবাহন।
ফুলছড়ি থানার ওসি মো. দুরুল হুদা জাগো নিউজকে বলেন, ‘থানায় মাত্র একটি গাড়ি বরাদ্দ থাকায় অপারেশন থেকে শুরু করে আদালতে আসামি নেওয়া পর্যন্ত আমাদের অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়। বিশেষ করে বড় ধরনের ক্রিমিনাল নিয়ে যাওয়া আসা করতে অনেক সমস্যা হয়। আসামি পালিয়ে যায় কি-না শঙ্কায় থাকেন পুলিশ সদস্যরা। বিয়ষটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানালেও আজ পর্যন্ত গাড়ি বরাদ্দ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
‘কোনো মামলার কাজে গেলেও নিজের বাইক ব্যবহার করতে হয়। সেখানে কিছু তেল খরচ বাবদ খুশি হয়ে অনেকেই বকশিশ দেয়। কিন্তু আসামি গ্রেফতার বা থানা থেকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য খরচ কেউ দেয় না। যে পুলিশ সদস্য ওই মামলার দায়িত্বে থাকেন, তাকেই খরচ বহন করতে হয়’—পুলিশ সদস্য
সাঘাটা থানায় পুলিশের জন্য দুটি সরকারি গাড়ি বরাদ্দ রয়েছে। এ থানার পুলিশ সদস্যদের দাবি, একটি গাড়ি ওসির জন্য বরাদ্দ। আরেকটি গাড়ি বিভিন্ন ধরনের অভিযানে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আসামিকে আদালতে নিতে কোনো গাড়ি নেই। পুলিশ সদস্যদের পকেটের টাকায় আসামিকে বহন করতে হয়। তবে আসামির সংখ্যা বেশি হলে প্রিজন ভ্যান ব্যবহার করা হয়।’
থানায় আসামি নিয়ে যাওয়ার জন্য নিজস্ব কোনো গাড়ি নেই বলে জানান সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মাদ আমানউল্লাহ।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসামি গ্রেফতারের পর মামলার দায়িত্বে পুলিশের যে উপপরিদর্শক (এসআই) থাকেন, তিনি তার পকেটের টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া করে আসামিকে আদালতে পৌঁছে দেন। আসামির সংখ্যা বেশি হলে পুলিশ লাইনস থেকে প্রিজন ভ্যান নিয়ে গিয়ে আসামিকে আদালতে হাজির করতে হয়।’
‘গাড়ি না থাকায় পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকি নিয়ে আসামিদের আদালতে পৌঁছে দিতে হয়। তবে সমস্যাটা শুধু গাইবান্ধার না, সারাদেশের চিত্রই একই রকম’—জেলা পুলিশ সুপার
পলাশবাড়ী থানায় তিনটি গাড়ি রয়েছে। থানাটি ছোট হওয়ায় তাদের গাড়ি নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না বলে দাবি এখানকার দায়িত্বরত ইনচার্জ সরোয়ার আলম খানের।
আরও পড়ুনসারাদেশে লোডশেডিং, হামলার আশঙ্কায় পুলিশের সহায়তা চাইলো পল্লী বিদ্যুৎ
একই অবস্থা গাইবান্ধা সদর থানার। থানা থেকে আদালতের দূরত্ব মাত্র এক কিলোমিটার হওয়ায় তাদের আসামি পৌঁছে দিতে কোনো সমস্যা হয় না।
আরও পড়ুনপুলিশে বদলি ২৩ কর্মকর্তা, নতুন ডিআইজি রংপুর-বরিশালে
জেলা শহর থেকে কাছাকাছি সাদুল্লাপুর থানা। এ থানার পুলিশ সদস্যরা জানান, শহরের কাছাকাছি হওয়ায় আদালতে আসামি পৌঁছে দিতে তাদের কোনো সমস্যা হয় না। তবে আসামির সংখ্যা বেশি হলে পুলিশ সদস্যদের নিজের পকেটের টাকায় আসামিদের আদালতে পৌঁছে দিতে হয়।
আরও পড়ুনআদালতে গিয়েও ‘প্রত্যাখ্যাত’ দাগনভূঞার সেই ওসি
গোবিন্দগঞ্জ থানায় তিনটি গাড়ি বরাদ্দ রয়েছে। এলাকাটিতে সবচেয়ে বেশি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হয় বলে জানা গেছে। বড় ধরনের অপারেশনে গাড়ির প্রয়োজন হলেও আসামি আদালতে পৌঁছে দিতে কোনো ধরনের সমস্যা হয় না বলে জানান এই থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যরা। আদালত থেকে প্রিজন ভ্যানে করে আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়।
আরও পড়ুন‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জুতা টানছে পুলিশ’ প্রচারণা অসত্য, দাবি পুলিশের
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কিছু থানা বাদে বেশিরভাগ থানায় দায়িত্বরত পুলিশের সংখ্যার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা একেবারে সীমিত। প্রায় সময় নিজেদের খরচে ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের।
আরও পড়ুন‘গত ৬ মাসে কোনো দলীয়করণ ছাড়াই পুলিশে নিয়োগ হয়েছে’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ সদস্য বলেন, ‘কোনো মামলার কাজে গেলেও নিজের বাইক ব্যবহার করতে হয়। সেখানে কিছু তেল খরচ বাবদ খুশি হয়ে অনেকেই বকশিশ দেয়। কিন্তু আসামি গ্রেফতার বা থানা থেকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য খরচ কেউ দেয় না। যে পুলিশ সদস্য ওই মামলার দায়িত্বে থাকেন, তাকেই খরচ বহন করতে হয়।’
আরও পড়ুন৭ এএসপিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠালো সরকার
এ বিষয়ে গাইবান্ধা পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘জেলার থানাগুলোতে পুলিশের জন্য চাহিদামতো গাড়ি বরাদ্দ নেই। যে কারণে গ্রেফতার আসামিদের থানা থেকে আদালতে পৌঁছে দিতে পুলিশ সদস্যদের নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে আসামি আদালতে নেওয়ার পথে পালানোর শঙ্কা থাকে।’
আরও পড়ুনমাদক কারবারির সঙ্গে যোগাযোগ, ৫ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত
তিনি বলেন, ‘গাড়ি না থাকায় পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকি নিয়ে আসামিদের আদালতে পৌঁছে দিতে হয়। তবে সমস্যাটা শুধু গাইবান্ধার না, সারাদেশের চিত্রই একই রকম।’
এসআর/জেআইএম