দ্য গার্ডিয়ান-এ তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড। শতভাগ ন্যাচারালভাবে গঠিত শরীরের এই ৯০ বছর বয়স্ক বডিবিল্ডার এ পর্যন্ত ১৯ বার জাতীয় শিরোপা জিতেছেন। তাঁর দাবি, সামনে আরও শিরোপা জয়ের সুযোগ রয়েছে।প্রতিবেদনের চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো সকলকে অনুপ্রেরণা যোগাতে।
দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের গল্প বলছিলেন তশিসুকে কানাজাওয়া। হঠাৎ থেমে গিয়ে অদ্ভুত এক প্রস্তাব দিলেন, ‘আমি কি এখন আমার পোশাকটা খুলে দেখাব?’কথা শেষ করেই কোমর পর্যন্ত পোশাক খুলে ফেললেন তিনি। দেখা গেল মসৃণ, রোদে পোড়া ত্বকের রং, সুঠাম বুকের পেশি এবং দুই বাহুজুড়ে দড়ির মতো স্পষ্ট শিরা-উপশিরা, যা আসলে অসংখ্য ঘণ্টা জিমে কাটানোর ফল।
মসৃণ, রোদে পোড়া ত্বকের রং, সুঠাম বুকের পেশি এবং দুই বাহুজুড়ে দড়ির মতো স্পষ্ট শিরা-উপশিরাতবে কানাজাওয়ার শরীরকে আরও বিস্ময়কর করে তুলেছে অন্য একটি বিষয়। গত মাসে, আরেকটি বড় প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঠিক এক দিন আগে ৯০তম জন্মদিন উদ্যাপন করেছেন এই বডিবিল্ডার।
হিরোশিমায় নিজের জিমে বসে গ্রিন টি পান করার সময় কানাজাওয়ার চোখে যেন দুষ্টুমি ঝিলিক দেয়। তিনি স্মরণ করেন, জাপান মাস্টার্স বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপের ৮৫ বছরের বেশি বয়সী বিভাগে আরও সাতজন প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে জয়ী হওয়ার কথা। এটি ছিল তাঁর ১৯তম জাতীয় শিরোপা। তবে তাঁর দাবি, এটিই শেষ নয়।
স্কুলজীবনে তিনি ছিলেন প্রতিভাবান সাঁতারু। এরপর পেশাদার বডিবিল্ডার হওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেন তিনিসাঁতার থেকে বডিবিল্ডিং
১৯৩৬ সালে জাপান সাগরের উপকূলবর্তী শিমানে প্রিফেকচারে জন্ম কানাজাওয়ার। স্কুলজীবনে তিনি ছিলেন প্রতিভাবান সাঁতারু। ১ হাজার ৫০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে ভালো করতেন। কিন্তু পেশির একটি সমস্যার কারণে অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে যায়। এরপর পেশাদার বডিবিল্ডার হওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেন তিনি।
‘আমার মা এ বিষয়ে কিছুটা সন্দিহান ছিলেন, তবে সমর্থন যোগাতেন আমাকে। কিন্তু বাবা একেবারেই রাজি ছিলেন না। তাঁর মনে হতো, তরুণদের কাজ করা উচিত,’ বলেন কানাজাওয়া। ‘আমি তাঁদের বলেছিলাম, জাপানের সেরা হতে চাই। তবে সেই জায়গায় পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় লাগবে।’
আমি তাঁদের বলেছিলাম, জাপানের সেরা হতে চাই'এরপরের পাঁচ বছর অনেকটা সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেই কাটান তিনি। প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা অনুশীলন করতেন। খাবার বলতে মায়ের রান্না করা সাধারণ সব ট্র্যাডিশনাল জাপানি পদ। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে যে টাকা পেতেন, তা খরচ করতেন দুধ ও পনির কিনতে।
২৪ বছর বয়সে বাবা-মাকে দেওয়া কথা রাখেন কানাজাওয়া। জেতেন ‘মিস্টার জাপান’ খেতাব। তিন বছর পর আবারও একই শিরোপা জেতেন। এরপর আরও অনেক পদক অর্জন করেন তিনি।
২৪ বছর বয়সে জেতেন ‘মিস্টার জাপান’ খেতাব।১৯৬৭ সালে কানাডার মন্ট্রিয়লে অনুষ্ঠিত ‘মিস্টার ইউনিভার্স’প্রতিযোগিতায় কিংবদন্তি বডিবিল্ডার আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার ও চ্যাম্পিয়ন সার্জিও অলিভার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেই প্রতিযোগিতায় চতুর্থ হন কানাজাওয়া। ৮০ বছর বয়সের পরও তিনি ছয়বার ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন।
‘আমি আমার শরীরের জন্য যা ভালো, সেটাই করি’
দীর্ঘ জীবন ও শরীরের সক্ষমতার পেছনে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকেই কৃতিত্ব দেন কানাজাওয়া। তিনি কখনো ধূমপান করেননি, মদও পান করেননি। কয়েক দশক আগে মাংস ও মাছ খাওয়াও ছেড়ে দিয়েছেন।
দীর্ঘ জীবন ও শরীরের সক্ষমতার পেছনে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকেই কৃতিত্ব দেন কানাজাওয়াতাঁর খাবারের তালিকায় মূলত থাকে বাদামি চালের সঙ্গে সামান্য ফুরিকাকে, নাত্তো এবং মিসো স্যুপ। স্যুপে তিনি দুটি কাঁচা ডিমও মিশিয়ে নেন। ‘আগে দিনে ছয়বার প্রোটিন শেক খেতাম। এখন তিনবার খাই। বয়স বাড়ার সঙ্গে এত বেশি তরল খাবার হজম করা কঠিন হয়ে গেছে,’ বলেন তিনি।
ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এখন আর স্কোয়াট বা বেঞ্চ প্রেস করেন না। ফ্রি ওয়েটের পরিবর্তে মেশিন ব্যবহার করেন।‘এই বয়সে আমার শরীরের জন্য যা ভালো, আমি সেটাই করি।’গুরুতর কোনো অসুস্থতাও হয়নি তাঁর। সম্প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন।
ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছেতাঁর ভাষ্য, পরীক্ষার ফলাফলে এমন কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা সাধারণত তাঁর চেয়ে অনেক কম বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়। ‘আগের তুলনায় এখন ওজন নিয়ে ব্যায়াম করার পর সুস্থ হতে বেশি সময় লাগে। তাই সেটের মধ্যে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিই এবং রাতে প্রায় সাত ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করি,’ বলেন কানাজাওয়া। হিরোশিমার নিজের জিমে সপ্তাহে ছয় দিন, প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে অনুশীলন করেন তিনি। জিমটি পারমাণবিক বোমা হামলায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে নির্মিত শান্তি স্মৃতিসৌধের কাছেই।
‘আমি শতভাগ ন্যাচারাল’
আয়নার সামনে পেশিবহুল শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে কানাজাওয়া বলেন, ‘আর আমি শতভাগ ন্যাচারাল।’ অর্থাৎ তাঁর সাফল্যের পেছনে কর্মক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধ নয়, রয়েছে কঠোর পরিশ্রম—এ কথাটিই বোঝাতে চেয়েছেন তিনি। এরপর হেসে বলেন, ‘আর আমার মাথাও ঠিক আছে, তাই তো?’দুইবার ‘মিস্টার জাপান’ হওয়ার পর ৩০-এর মাঝামাঝি বয়সে বডিবিল্ডিং থেকে অবসর নেন কানাজাওয়া। তবে ৫০ বছর বয়সে আবার প্রতিযোগিতামূলক বডিবিল্ডিংয়ে ফিরে আসেন। এর পেছনে ছিল অসুস্থ স্ত্রীকে উৎসাহ দেওয়ার ইচ্ছা।
‘আর আমি শতভাগ ন্যাচারাল।
‘আমার স্ত্রী সব সময় আমাকে সমর্থন করতেন। কিন্তু তিনি প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। অবসর নেওয়ার পর আমি নিজেকে কতটা ছেড়ে দিয়েছিলাম, তা বুঝতে পারি। তখন তাঁকে দেখাতে চেয়েছিলাম, সবকিছুই সম্ভব,’ বলেন তিনি। সাত বছর পর মাস্টার্স বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম হন কানাজাওয়া। তাঁর বয়ানে, ‘সেটিই ছিল আমার শারীরিক সক্ষমতার সেরা সময়।’
বয়স বাড়লেই থেমে যেতে হবে, এমন নয়
জাপানকে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বয়স্ক হয়ে পড়া সমাজ হিসেবে দেখা হয়। দেশটির জনসংখ্যা কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক সংকট এবং তরুণদের ওপর স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার বাড়তে থাকা ব্যয়ের চাপ নিয়ে প্রায়ই নেতিবাচক আলোচনা হয়। ১২ কোটি ৩৭ লাখ জনসংখ্যার দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের বয়স ৬৪ বছরের বেশি।
কানাজাওয়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবন থামিয়ে দেওয়ার ধারণার সঙ্গে একমত ননগত মাসে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশটিতে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। তাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। তবে কানাজাওয়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবন থামিয়ে দেওয়ার ধারণার সঙ্গে একমত নন। ‘বয়স্ক জাপানিরা অসাধারণ সব কাজ করছেন। কিন্তু আমার ভয় হয়, তাঁদের অনেকেই তরুণ বয়সে যে কাজগুলো করতেন, সেগুলো ছেড়ে দেন,’ বলেন তিনি।
এ মাসে জাপান ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপের মিশ্র জুটি বিভাগে ৩৯ বছরের ছোট আসুকা মিয়ামের সঙ্গে জুটি বেঁধে চতুর্থ হয়েছেন কানাজাওয়া।
'আমি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত বডিবিল্ডার হয়ে থাকতে চাই'আলাপের শেষে এসে অনেকটা আপন মনে বললেন, ‘এটা অনেকটা এমন যে আপনার পায়ের পেশি দুর্বল হতে শুরু করল, আর আপনি ভাবলেন, এটাই স্বাভাবিক; তাই কিছু না করে সেটি হতে দিলেন। আমি কখনো এমন হতে চাইনি। এ কারণেই আমি যা করি, তা করে যাই। আমি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত বডিবিল্ডার হয়ে থাকতে চাই।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
ছবি: ইন্সটাগ্রাম