‘মধ্যপ্রাচ্যে তেল আছে, আর চীনের আছে রেয়ার–আর্থ বা দুষ্প্রাপ্য মৌল’—নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চীনা নেতা ডেং জিয়াওপিংয়ের করা এই মন্তব্য সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।
অনেকেই মনে করেন, ডেং জিয়াওপিংয়ের এ কথার ভেতরেই এক গোপন হুমকির বার্তা ছিল। গত এক বছরের ঘটনাপ্রবাহ এ ধারণাকে আরও জোরালো করেছে।
আজ এতে কোনো সন্দেহ নেই যে রেয়ার–আর্থের ওপর চীনের এই নিয়ন্ত্রণ একটি শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এটা বিশ্বজুড়ে তৈরি করেছে গভীর দুশ্চিন্তা এবং বিকল্প উৎস খোঁজার এক উন্মাদ প্রতিযোগিতা। শিল্প হিসেবে এটি খুব বড় না হলেও আধুনিক প্রযুক্তিতে এর ভূমিকা অপরিসীম।
তবে চীন এই সুবিধার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করলেও তাদের এই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বিশ্বকে জিম্মি করার মতো কোনো দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের ফল নয়। প্রকৃতপক্ষে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের পটভূমিতে অভ্যন্তরীণ রকমারি স্বার্থের এক জটিল সংমিশ্রণ থেকেই আজকের এ পরিস্থিতির জন্ম।
চীন হঠাৎ কেন উত্তর কোরিয়া নিয়ে এমন উদ্বিগ্নডেং জিয়াওপিং যখন ওই ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র তখন প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ শেষ করেছে। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, সেই মার্কিন অভিযান একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছিল, আধুনিক যুদ্ধ পরিচালনায় চীনের দুর্বলতা কোথায় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে সংঘাতের কারণ হতে পারে।
কিন্তু বলা যত সহজ, করা ততটা ছিল না। নিজেদের বাজার সুসংহত করার প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো আসলে নেওয়া হয়েছিল দেশের ভেতরের অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা থামানোর জন্য। কারণ, সেই অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার ফলে দাম অনেক কমে যাচ্ছিল এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল।
ভূরাজনৈতিক যুদ্ধে সরবরাহ শৃঙ্খলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার কোনো দূরদর্শী পরিকল্পনা থেকে এর উৎপত্তি হয়নি। ২০১০ সালে সেনকাকু (চীনে ডিয়াওয়ু নামে পরিচিত) দ্বীপপুঞ্জকেন্দ্রিক বিতর্কিত ঘটনার সময় চীন ও জাপানের মধ্যে সেই উত্তেজনার পর জাপানে রেয়ার–আর্থ রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং তখনই ডেং জিয়াওপিংয়ের সেই উক্তিটি প্রথমবারের মতো ভাইরাল হয়।
যুক্তরাষ্ট্র–চীন: দুই পরাশক্তির বিশ্বে বাংলাদেশ কী করবেতবে গবেষণায় দেখা গেছে, এটি জাপানকে শাস্তি দেওয়ার কোনো কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ছিল না। দেশটির রেয়ার–আর্থের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, পরস্পরবিরোধী নানা অগ্রাধিকারের ভেতর দিয়েই তাদের এই নীতি রূপ পেয়েছে।
২০১০ সালের সেই সংকটের পর থেকেই বেইজিং বুঝতে পারে যে রেয়ার–আর্থকে অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। আর এই অস্ত্র কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়, তা চীন শিখেছে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত সেশন ও রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেখেই।
চীনের এই আধিপত্যের পেছনের আসল গল্পটা জানা জরুরি। কারণ, এটি বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার বর্তমান নিরাপত্তা সংকটকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে—যখন এক দেশ নিজের নিরাপত্তা বাড়াতে কোনো পদক্ষেপ নেয়, অন্য দেশ তা থেকে হুমকি বোধ করে এবং পাল্টা ব্যবস্থা নেয়—এভাবেই উত্তেজনার পারদ বাড়তে থাকে।
তবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এখন যেভাবে একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তার ঝুঁকি শুধু অর্থনৈতিক যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। অর্থনৈতিক ও সরবরাহ শৃঙ্খল বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই ভয় দুই দেশের দূরত্ব বাড়াচ্ছে এবং উভয় পক্ষেই উগ্র মনোভাবকে উসকে দিচ্ছে।
বাণিজ্যযুদ্ধের একটি সমাধান চায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।সস্তা ও নোংরা পথ
১৯৫০-এর দশকের শেষ দিক থেকে নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাব সত্ত্বেও ইনার মঙ্গোলিয়ার ‘বায়ান ওবো’ খনি চীনের রেয়ার–আর্থ শিল্পের মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যা এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় সঞ্চয়ক্ষেত্র। ১৯৬০-এর দশকে দক্ষিণাঞ্চলীয় জিয়াংশি ও গুয়াংডং প্রদেশে নতুন নতুন খনির সন্ধান মেলে, যা পরে হেভি রেয়ার–আর্থ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
তবে ১৯৮০-এর দশকের প্রথমার্ধে রসায়নবিদ জু গুয়াংশিয়ান যখন কম খরচে রেয়ার–আর্থ পৃথক করার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, তখনই কেবল চীন বড় মাপের মানসম্পন্ন উৎপাদন শুরু করতে সক্ষম হয়।
চীনা নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন, রেয়ার–আর্থ এমন এক প্রাকৃতিক সম্পদ, যা কোনোভাবেই অপচয় করা যাবে না। ১৯৮২ সালের শুরুতেই ডেং জিয়াওপিং এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ফাং ই নির্দেশ দেন ‘রেয়ার–আর্থ ও অন্যান্য দুর্লভ ধাতুর উৎপাদন বাড়াতে হবে।’ তবে আশির দশকজুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো।
‘রেয়ার–আর্থ’ কিন্তু বাস্তবে মোটেও দুর্লভ বা বিরল কিছু নয়; আবিষ্কারের প্রাথমিক যুগে অজ্ঞতার কারণে এর নাম এমন হয়েছিল। তবে উত্তোলনযোগ্য পরিমাণে রেয়ার–আর্থের উপস্থিতি পাওয়া বেশ কঠিন, আর এগুলো প্রক্রিয়াজাত করার প্রযুক্তি অত্যন্ত জটিল ও চরম পরিবেশদূষণকারী।
তাই রপ্তানি বাড়াতে গিয়ে এই খাতে শিথিল তদারকি মেনে নেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালের মধ্যে চীনের উৎপাদন ১৯৭৮ সালের তুলনায় ১০ গুণ বেড়ে যায় এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে চীন বিশ্বের বৃহত্তম রেয়ার–আর্থ উৎপাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
আমেরিকা ও ইউরোপ চীনের এই উত্থানকে সানন্দে স্বাগত জানিয়েছিল। বলে রাখা ভালো, ‘রেয়ার–আর্থ’ কিন্তু বাস্তবে মোটেও দুর্লভ বা বিরল কিছু নয়; আবিষ্কারের প্রাথমিক যুগে অজ্ঞতার কারণে এর নাম এমন হয়েছিল। তবে উত্তোলনযোগ্য পরিমাণে রেয়ার–আর্থের উপস্থিতি পাওয়া বেশ কঠিন, আর এগুলো প্রক্রিয়াজাত করার প্রযুক্তি অত্যন্ত জটিল ও চরম পরিবেশদূষণকারী।
১৯৯০-এর দশকজুড়ে চীনের এই উদীয়মান শিল্পকে দেশের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হিসেবেই দেখা হতো। ১৯৯০ সালে এগুলোকে ‘সংরক্ষিত ও কৌশলগত খনিজ’ হিসেবে ঘোষণার পর, চীন অনুসন্ধান ও প্রক্রিয়াকরণে বিদেশি বিনিয়োগ সীমিত করতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় সরকারের রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারগুলোও রাজস্ব বাড়াতে দ্রুত খনি সম্প্রসারণ করে।
চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র: ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের ঝুঁকিকিন্তু কোনো কার্যকর তদারকি না থাকায় শতকের শেষভাগে এসে চীনের রেয়ার–আর্থ শিল্প এক বিশৃঙ্খল রূপ নেয়: অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদনের ফলে দেশীয় বাজারে দরপতন ঘটে এবং রপ্তানি মূল্য তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
আজকের অনেক বিশ্লেষক দাবি করেন, বিদেশি প্রতিযোগীদের বাজার থেকে নিশ্চিহ্ন করতেই চীন ইচ্ছে করে রেয়ার–আর্থের দাম কমিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চীনা কর্মকর্তারা নিজেরাই এই কম দাম নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
২০০২ সালের মধ্যে বেইজিং এই বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কেন্দ্রীয় সরকার অবৈধ খনি ও পরিবেশদূষণকারী কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
এরপর ২০০৫ সালে বেইজিং রেয়ার–আর্থের রপ্তানি কর ফেরত সুবিধা বাতিল করে এবং ২০০৭ সালে সব ধরনের আকরিক, অক্সাইড ও উপাদান রপ্তানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।
এই পদক্ষেপগুলো বেইজিংয়ের নীতির এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়—সর্বোচ্চ রপ্তানির পথ থেকে সরে এসে তারা সম্পদের সুরক্ষা ও অতি উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দেয়। কারণ, রেয়ার–আর্থ পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ নয়, একবার শেষ হলে আর পাওয়া যাবে না।
একই সঙ্গে চীনা কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছিল যে তাদের নিজস্ব শিল্প খাতের জন্যই এই উপাদানগুলো কতটা জরুরি।
বেইজিংয়ে দুই দেশের রাষ্ট্রপতির শীর্ষ সম্মেলনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন সামরিক বাহিনীর সদস্যরাসংকট ও বিভ্রান্তি
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকারগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কারণ উৎপাদন কমলে তাদের ট্যাক্স রাজস্ব কমে যেত। এমনকি ২০১০ সালেও মোট উৎপাদন নির্ধারিত কোটার চেয়ে ৩৫ শতাংশের বেশি ছিল। দক্ষিণাঞ্চলীয় চীনে অবৈধভাবে উত্তোলিত রেয়ার–আর্থ বিশ্বজুড়ে মোট হেভি রেয়ার–আর্থ ব্যবহারের প্রায় অর্ধেক জোগান দিত।
একই বছরের শেষের দিকে জাপানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সীমান্ত বিতর্ক চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে আরও সংশয় বাড়িয়ে দেয়। বিতর্কিত ডিয়াওয়ু/সেনকাকু দ্বীপের কাছে একটি চীনা ট্রলার জাপানি কোস্টগার্ডের জাহাজে ধাক্কা দিলে জাপানি কর্তৃপক্ষ ট্রলারের ক্যাপ্টেনকে গ্রেপ্তার ও বিচারের উদ্যোগ নেয়।
বেইজিং এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দেশে জনমত গঠিত হতে দেয় এবং প্রায় একই সময়ে খবর রটে যে চীন জাপানে রেয়ার–আর্থ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। জাপানের ইলেকট্রনিকশিল্প এতে তাৎক্ষণিকভাবে বিশাল ধাক্কা খায়।
তবে রপ্তানি বন্ধের সেই সিদ্ধান্ত সত্যি বেইজিং থেকে এসেছিল কি না, তা আজও রহস্যাবৃত। ঘটনা যা-ই হোক, এই সংকট চীনা সরকারকে প্রথমবারের মতো বুঝিয়ে দেয় যে তাদের হাতে কী বিশাল এক লিভারেজ বা ক্ষমতার চাবিকাঠি রয়েছে। এর পর থেকেই তারা রেয়ার–আর্থ শিল্পকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে নিতে এবং অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়।
চীনের হাতে যে ‘অস্ত্র’ তুলে দিয়ে এখন ভুগছে যুক্তরাষ্ট্রচীনা গণমাধ্যমে তখন রেয়ার–আর্থের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরদার হতে থাকে। কেউ কেউ এর ভূরাজনৈতিক ব্যবহারের ওপর জোর দিলেও উগ্র জাতীয়তাবাদী কণ্ঠগুলো অর্থনৈতিক সুরক্ষার কথা তোলে।
তা সত্ত্বেও বেইজিং সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল। স্টেট প্ল্যানিং কমিশনের রেয়ার–আর্থ অফিসের সাবেক প্রধান হং ফেং রেয়ার–আর্থকে ‘রাজনৈতিক ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন। রাশিয়ার বারবার প্রাকৃতিক গ্যাসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ টেনে তিনি দেখান, কীভাবে এমন আচরণ ভুক্তভোগী দেশগুলোকে বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য করে।
তা ছাড়া সেই সময় চীনের এই শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো সুসংগঠিত কাঠামোও ছিল না। শুধু ২০১২ সালে এসে বেইজিং কেন্দ্রীয় তদারকি জোরদার করতে শুরু করে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে তারা কৌশলগত মজুত গড়ে তোলে।
মার্কিন গবেষণা সংস্থা র্যান্ডের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ঠিকই বলা হয়েছে, ২০১০-এর দশকে বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য ছিল ‘অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আগে শিল্পের স্থিতিশীলতা আনা।’
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং চীনের নেতা সি চিন পিংশক্তি নিয়ে প্রত্যাবর্তন
ডিয়ায়ু/সেনকাকু দ্বীপের ঘটনাটি পুরো বিশ্বের জন্যই এক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত ছিল।
বিশ্বরাজনীতিতে চীনা অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভয়াবহ রূপ প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়। ‘ডিকপলিং’ বা ‘ডি-রিস্কিং’-এর মতো শব্দগুলো আলোচনায় আসার এক দশক আগেই জাপান বিকল্প উৎস তৈরিতে জোর দেয়। যার ফলে ২০১০ সালে যেখানে তারা ৯০ শতাংশ রেয়ার–আর্থ চীন থেকে আনত, আজ তা কমে ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে।
রেয়ার–আর্থের বিষয়টি মার্কিন-চীন সম্পর্কের আড়ালে চলে যায়। এটি আবার সামনে আসে গত দশকের শেষভাগে, যখন ওয়াশিংটন চীনের ওপর চরম অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। চীনের বেসরকারি খাতের ওপর সি চিন পিংয়ের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিরোধে কঠোর আচরণ আমেরিকার সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন চীনের অন্যতম প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘হুয়াওয়ে’-কে কালো তালিকাভুক্ত করে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়। হুয়াওয়ের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা বেইজিংয়ের জন্য এক বিরাট ধাক্কা ছিল। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তখন রেয়ার–আর্থ আটকে দেওয়ার পরামর্শ দিলেও বেইজিং তাড়াহুড়ো করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই বিরল খনিজের বিকল্প উৎস তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। সামান্য বিকল্প উৎস তৈরি করতে পারলেই চীনের একচেটিয়া ভূরাজনৈতিক প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। অন্যদিকে চীনের এই আধিপত্যেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এর পরিবর্তে তারা আমেরিকার রিপাবলিকান-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর সয়াবিন ও জ্বালানি পণ্যের ওপর দেখেশুনে শুল্ক আরোপ করে। হুয়াওয়ে ঘটনাটি চীনের একটি বড় দুর্বলতা উন্মোচিত করে দিয়েছিল—উন্নত সেমিকন্ডাক্টরের জন্য তারা তখনো বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। তাই বেইজিং বুঝতে পেরেছিল, সময়ের আগে রেয়ার–আর্থের ঘুঁটি চাললে তা উল্টো তাদের দিকেই ঘুরে আসতে পারে।
বেইজিং সব দিক থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ২০২০ সালের মে মাসে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে তারা ‘ডুয়াল সার্কুলেশন’ কৌশল গ্রহণ করে—যার মূল লক্ষ্য ছিল সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলা।
২০২০ সালের শেষের দিকে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন পাস করে বিদেশের বাজারে পণ্য সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয়। আর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ‘চীন রেয়ার–আর্থ গ্রুপ’ গঠন করা হয়, যার পুরো নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয় ‘স্টেট কাউন্সিল’-এর হাতে।
কিন্তু ওয়াশিংটন যখন চীনা চিপশিল্পকে ধ্বংস করতে বিশ্বজুড়ে সর্বাধুনিক চিপ ও চিপ তৈরির যন্ত্রাংশ বিক্রিতে অভূতপূর্ব নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তখনই চীন শেষমেশ প্রতিক্রিয়া হিসেবে খনিজ রপ্তানিতে হাত দেয়।
বিশ্ব ভাগ হয়ে গেছে, কোন দিকে নতুন শাসনব্যবস্থা২০২২ সালের অক্টোবরে বাইডেন প্রশাসনের সেই নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুনে এনভিডিয়ার এ৮০০ চিপ অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে, ঠিক তার পরের মাসেই (জুলাইয়ে) চীন ঘোষণা দেয় যে ‘গ্যালিয়াম’ ও ‘জার্মেনিয়াম’ রপ্তানির জন্য এখন থেকে বিশেষ লাইসেন্স ও চূড়ান্ত ব্যবহারের তথ্য জমা দিতে হবে। এই দুটি উপাদান চিপ তৈরির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
চীন যদি এই দুটি খনিজের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করত, তবে মার্কিন জিডিপি-৩.৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারত।
এর ছয় মাস পর মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের চীনবিষয়ক কমিটি এক প্রতিবেদনে দেশে রেয়ার–আর্থের সুষম সরবরাহ নিশ্চিত করতে করছাড়ের সুপারিশ করে। তার মাত্র এক সপ্তাহ পর, ২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বর, চীন রেয়ার–আর্থ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যাতে বিশ্বজুড়ে বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরির পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
এর ঠিক এক বছর পর চীন এমন এক নীতি জারি করে, যেখানে প্রথমবার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে নিশানা করা হয়; বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালিয়াম রপ্তানির সব লাইসেন্স আবেদন সরাসরি বাতিল বলে গণ্য হবে।
দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের সময় এই পাল্টাপাল্টি সংঘাত চূড়ান্ত রূপ নেয়।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ঘোষণার মাত্র দুদিন পর, ৪ এপ্রিল বেইজিং সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সাতটি রেয়ার–আর্থ ও তা দিয়ে তৈরি স্থায়ী চুম্বক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের তালিকায় যুক্ত করে।
মে মাসে চীনের রেয়ার–আর্থ চুম্বক রপ্তানি একলাফে ৭৪ শতাংশ কমে যায়। জবাবে ওয়াশিংটন জেট ইঞ্জিন ও চিপ ডিজাইনিং সফটওয়্যার বিক্রিতে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
কিন্তু ২৯ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত শাখা প্রশাসনগুলোর তালিকা আরও সম্প্রসারিত করে। বলা হয়, কোনো কালোতালিকাভুক্ত চীনা কোম্পানির ৫০ শতাংশ মালিকানা থাকলেও সেই প্রতিষ্ঠান আমেরিকা থেকে কিছু কিনতে পারবে না।
এই পর্যায়ে এসে মার্কিন-চীন অর্থনৈতিক যুদ্ধ চরম রূপ নেয়। তবে সংঘাতের ভয়াবহতা দেখে উভয় পক্ষই শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
২০২৫ সালের সেই চরম সংকটের মুখোমুখি হওয়ার পর বেইজিং ও ওয়াশিংটন সাময়িকভাবে বিরতি নিয়েছে। কিন্তু উভয় দেশের উগ্রপন্থীরা এই বিরতিকে পরবর্তী লড়াইয়ের জন্য অস্ত্র শাণানোর সুযোগ হিসেবে দেখছে। উভয় সরকারই এখন নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেয়ার–আর্থ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই বিরল খনিজের বিকল্প উৎস তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। সামান্য বিকল্প উৎস তৈরি করতে পারলেই চীনের একচেটিয়া ভূরাজনৈতিক প্রভাব অনেকটাই কমে যায়।
অন্যদিকে চীনের এই আধিপত্যেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা মার্কিন কৌশলবিদদের মনে রাখা উচিত: রেয়ার–আর্থ প্রক্রিয়াজাতকরণের কিছু আধুনিক ক্ষেত্রে চীন এখনো জাপান ও আমেরিকার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
এই দিক থেকে রেয়ার–আর্থের বাজার অন্যান্য অর্থনৈতিক চোক পয়েন্টের মতোই—যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন বৈশ্বিক ডলার ব্যবস্থা কিংবা চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন ওষুধের কাঁচামালের বাজার। আপাতদৃষ্টে এগুলোকে চরম ক্ষমতার উৎস মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য এগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা কঠিন। এই পারস্পরিক নির্ভরতাই মূলত দুই দেশকে কিছুটা হলেও সংযত রাখতে বাধ্য করছে।
গ্লোরিয়া সিওং কোলবি কলেজের সহকারী অধ্যাপক; জেসিকা চেন ভাইস জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।